আমার সম্পর্কে

প্রথম স্কুলের গণিত স্যার এর নামটা আমি কিছুতেই মনে করতে পারছি না! ছ-ফুটের শরীর, ছিপছিপে গড়ন, লম্বা নাক…এইটুকু মনে আছে, আর মনে আছে স্যারের ক্লাসে গল্প করা, ঐ গল্প শুনতে শুনতেই গণিতের প্রতি ভালোলাগা তৈরী হয়েছিল। কত কি মনে আছে! স্যারকে কেন মনে নেই! ভীষণ অসহায় লাগে মাঝে মাঝে নিজেকে! স্যারকে আমার মানুষ বলে মনে হতো না! মনে হতো কোনো দেবতা, গল্প শোনাতেন যেন স্বর্গ রাজ্যের, ভ্রমনপ্রিয় ছিলেন স্যার, ভ্রমনের নেশাটা হয়তো তখনই মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

কলেজে ওঠার আগ পর্যন্ত কোনো দিন ‘পিকনিকে’ যেতে পারি নি, আম্মার বেশ ভয় ছিল আমাকে হারিয়ে ফেলার। স্কুলে প্রতিবছর সব বন্ধুরা ‘পিকনিক’-এ যেত, আমি ওদের গল্প শোনতাম। কলেজের পর দু বছরেই আমি সারা বাংলাদেশ ঘুরেছি, চার-পাঁচটি জেলা বাদ দিয়ে প্রায় সবকটি। যতটা না প্রকৃতি দেখেছি, তারচেয়ে বেশি দেখেছি মানুষ। মানুষ দেখায় আমার কোনো ক্লান্তি নেই। একা একজন দেখতে যেমন ভালো লাগে তেমনি ভালো লাগে মিছিল, মেলা বা ‘মিউজিক কনসার্ট’-এ মানুষের ভিড় দেখতে। একা একজন এবং ভীরের একজন, একই মানুষে দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। মানুষ বড়ই আজব প্রাণী, যে চোর সে-ই আবার পিতা, যে ভাই-বন্ধু, সেই আবার ভয়ংকর পিশাচ। অবস্থা এবং অবস্থান বদলে দেয় চরিত্র।

প্রথম ভালোলাগার নারীকে ভালোবাসার কথা বলতে পারিনি, না আমি ভীতু ছিলাম না, এখনো নই বরং যে দূরত্বটুকু না থাকলে আনমনে হাত ধরে বলা যায়, “চলো একসাথে পথ চলি”, ঐ দূরত্বটুকুই অতিক্রম করা হয়নি, ইচ্ছে করেনি।

কোনো আদর্শ, কোনো ক্ষমতার মোহ ছাড়াই কলেজে মূল ধারার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলাম, একবছর যেতে না যেতেই ঘোর কেটে গেছে, মনে হয়েছে “কোনো লাভ নেই”। আছে হয়তো কোনো বিকল্প পথ। এরপর বামপন্থী বন্ধুদের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে দেখেছি তাদেরও নোংরামী। শিল্প, সাহিত্য সঙ্গ নিয়েছিল শৈশবেই, এরপর কোনোদিন ছেড়ে যায় নি। সেই শিল্প সাহিত্যই বাঁচিয়েছে, বাঁচিয়ে রাখছে এখনো। ছোটবেলায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’র দর্শনের পাঠচক্র থেকে আসার পর নিজেকে খুব জ্ঞানী মনে হতো, যত দিন গেছে নিজের প্রতি অবিশ্বাস বেড়েছে, বাড়ছে। ভীষণ অসহায় লাগে নিজেকে। দুটি মাত্র হাত, দুটি পা, ২৪ ঘন্টার দিন, কত কি করার বাকী!

‎’আমার ছোটবেলা খুব ভালো ছিল’ এটা মিথ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না আমার কাছে! ছিল, যেমন থাকার কথা ছিল তেমনই। আমি ইচ্ছে করেই তো বড় হয়েছি বা হচ্ছি! কেউ ঘাড় ধরে বড় করেনি! বয়স হয়তো বাড়ে নিজেই কিন্তু বড় হই আমরা নিজেরাই! মানুষের প্রতিটি বয়সই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উপভোগের, আনন্দের। বড় বা বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, মরে যাবো, এসব কোনো কিছু নিয়ে আমার কোনো ক্ষেদ নেই। মরার পরের জগতটাও আমি দেখতে চাই, কি আছে? কি নেই! যখন যা করার কথা তা করতে পারছি কিনা এটা নিশ্চিত করতে পারলেই হলো! উর্দুতে গালিব এর পরেই শ্রেষ্টতম কবি ‘মীর তকী মীর’ এর একটা শায়েরী আমার খুব প্রিয়, অনেকটা এমন- “মরে যাবো, হুম এর কারণ তো যথেষ্ট কিন্তু কেন বেঁচে আছি এটা দেখার জন্যই বেঁচে আছি!” আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি আত্মা অবিনশ্বর। একক আমি যদি সমগ্রের অংশ বলে নিজেকে ভাবতে পারি তাহলে আর স্বর্গ নরক ছাইপাশ ভাবনা নিয়ে মাথা নষ্ট করতে হয় না। আমি মানে কি শুধুই আমি? আমি মানে কি এই পৃথিবী, এই মহাবিশ্বেরই কোনো অংশ নই! “কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাবো!” এই ভাবনাগুলো ভীষণ যন্ত্রণা দেয়!

নেশাকে পেশায় রুপান্তরিত করার সৌভাগ্য খুব কম মানুষের হয়, আমারও হয় নি। তবে, নেশা পিছু ছাড়েনি, দুনিয়া দেখার নেশা, ছবি তোলা, বনসাই করা, বই সংগ্রহ, লেখালেখি করা আরো কত কী! দেশ বিদেশ ঘুরছি নেশা ও পেশার কারণে। চীন-জাপান-কোরিয়ার পর উত্তর আমেরিকার আনাচে-কানাচে ঘুরছি এখন। দক্ষিন আমেরিকায় যেতে চাই এরপর, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়াও। সময় অনেক কম, সময় সীমিত। এক জীবনে কত কীইবা করা যায়, দেখা যায়! আহারে! “জীবন এর ছোড ক্যানে!”

অনেক বছর ব্লগিং করেছি, আবার অনেক বছর করছি না। তবে, লেখালেখি থামেনি। টুকটাক লিখেছি, এখানে ওখানে। নিয়মিত লিখতে চাই আবারও, ভ্রমন-রাজনীতি-অর্থনীতি-এলোমেলো দিনপঞ্জি-অনুবাদ অথবা যা খুশি তাই! এজন্য শুরু করা এই ব্যক্তিগত ব্লগ। সকলের অকাট্য ভালোলাগা-মন্দলাগা জানতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *